পুরুষের হজের এহরাম
পুরুষ হাজির এহরাম হলো হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি ও বিধান। সাধারণত পুরুষের এহরাম বলতে দুই টুকরা সেলাইবিহীন কাপড় বোঝায়:
- ইযার: নিচের অংশে কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত জড়ানো হয়।
- রিদা: শরীরের ওপরের অংশে চাদরের মতো ব্যবহার করা হয়।
এহরামের কাপড় কেমন হওয়া উচিত?
এহরামের কাপড় সাধারণত সাদা, পরিষ্কার ও সেলাইবিহীন হয়। কাপড়টি এমন হওয়া উচিত যাতে শরীর যথাযথভাবে ঢাকা থাকে এবং ইবাদতের সময় চলাফেরায় অসুবিধা না হয়।
এহরাম পরার আগে
এহরাম পরার আগে গোসল করা, শরীর পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সুন্নত। এরপর নির্ধারিত মীকাত অতিক্রম করার আগে হজের নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করতে হয়।
এহরাম অবস্থায় পুরুষের গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
এহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য কয়েকটি বিষয় থেকে বিরত থাকা জরুরি। যেমন:
- সেলাই করা পোশাক পরা
- মাথা ঢেকে রাখা
- সুগন্ধি ব্যবহার করা
- চুল বা নখ কাটা
- শিকার করা
- দাম্পত্য সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট কাজ
এহরামের কাপড়ের পাশাপাশি এহরাম অবস্থার বিধানগুলো জানা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভুল হলে তার কাফফারা বা করণীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কিনুন
১. পুরুষের এহরাম কীভাবে পরবেন

পুরুষের এহরাম হলো দুই টুকরা সেলাইবিহীন কাপড়—নিচের অংশ ইযার এবং ওপরের অংশ রিদা। সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকাতেও পুরুষের জন্য এই দুই টুকরা সাদা, সেলাইবিহীন কাপড়ের কথা বলা হয়েছে।
ধাপে ধাপে
১. গোসল করুন
এহরামে প্রবেশের আগে গোসল করা সুন্নত।
২. এহরামের কাপড় পরুন
- ইযার কোমরের নিচের অংশে ভালোভাবে জড়িয়ে নিন।
- রিদা শরীরের ওপরের অংশে জড়িয়ে নিন।
- এহরাম এমনভাবে বাঁধুন যাতে চলাফেরার সময় খুলে না যায়।
৩. সুগন্ধি সম্পর্কে সতর্কতা
এহরামে প্রবেশের আগে সুগন্ধি ব্যবহার করার বিষয়ে সুন্নাহর নির্দেশনা রয়েছে; কিন্তু এহরামের নিয়ত ও তালবিয়া শুরু করার পর শরীর বা কাপড়ে নতুন করে সুগন্ধি লাগানো যাবে না।
৪. মীকাতের আগে প্রস্তুত থাকুন
বিমানযোগে গেলে মীকাতের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই এহরামের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। মীকাত অতিক্রম করে এহরাম ছাড়া এগিয়ে যাওয়া যাবে না। কিনুন
২. নিয়ত ও তালবিয়া
এহরামের মূল বিষয় হলো হজের নিয়ত করে তালবিয়া শুরু করা। সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান গাইড অনুযায়ী নিয়ত হৃদয়ে করা এবং মুখে হজের ঘোষণা করা যায়।
হজের জন্য বলতে পারেন:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ حَجًّا
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা হাজ্জান।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি হজের জন্য আপনার ডাকে হাজির।
এরপর তালবিয়া পড়বেন:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
উচ্চারণ:
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান-নিয়ামাতা লাকা ওয়াল-মুলক, লা শারীকা লাক।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই। কিনুন
৩. মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ
হজের ধরন অনুযায়ী তাওয়াফের সময় ও ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই আপনার হজ তামাত্তু, ইফরাদ নাকি কিরান—এটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে ৭ চক্কর তাওয়াফ করা হয়।
তাওয়াফের সময় নিজের জন্য, পরিবার ও উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারেন। নির্দিষ্ট কোনো দীর্ঘ দোয়া মুখস্থ না থাকলেও নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়।
রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে
পড়ার জন্য প্রসিদ্ধ দোয়া:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ, ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ, ওয়া কিনা আজাবান্নার।
অর্থ:
হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
৪. সাফা-মারওয়ার সাঈ
তাওয়াফের পর হজের ধরন অনুযায়ী সাফা ও মারওয়ার মধ্যে ৭ বার সাঈ করতে হয়।
সাফা থেকে শুরু করে মারওয়া পর্যন্ত একবার এবং মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত দ্বিতীয়বার—এভাবে ৭ বার পূর্ণ হবে।
সাঈর সময় জিকির, দোয়া ও তালবিয়া করতে পারেন। কিনুন
৫. ৮ জিলহজ — মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা
৮ জিলহজ হাজিরা মিনায় যান এবং সেখানে অবস্থান করে নামাজ, জিকির ও দোয়ায় সময় কাটান।
হজের দিনগুলোতে ভিড়, গরম ও শারীরিক পরিশ্রমের কারণে পর্যাপ্ত পানি পান, প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা এবং দলনেতার নির্দেশনা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ৯ জিলহজ — আরাফার দিন
এটি হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি।
হাজিরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। এই সময় বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার, জিকির ও দোয়া করা উচিত।
নিজের জন্য, বাবা-মা, পরিবার, সন্তান, মৃত স্বজন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারেন।
৭. মুযদালিফা
আরাফার অবস্থান শেষে হাজিরা মুযদালিফার দিকে যান।
সেখানে রাতযাপন এবং পরবর্তী হজের আমলের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সৌদি হজ মন্ত্রণালয় মুযদালিফার জন্য আলাদা বর্তমান নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।
৮. ১০ জিলহজ — কঙ্কর নিক্ষেপ
১০ জিলহজ মিনায় গিয়ে জামারাতুল আকাবা-তে কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়।
এরপর হজের ধরন ও আপনার আমলের ক্রম অনুযায়ী কুরবানি, মাথা মুণ্ডানো/চুল ছোট করা এবং এহরাম থেকে বের হওয়ার বিধান আসে।
পুরুষের জন্য মাথা মুণ্ডানো (হালক) অথবা চুল ছোট করা (কসর) রয়েছে; এ বিষয়ে আপনার হজের ধরন ও মাজহাব অনুযায়ী আলেম/মুয়াল্লিমের নির্দেশনা অনুসরণ করা উত্তম।
৯. তাওয়াফে ইফাদা
এরপর তাওয়াফে ইফাদা করা হয়। এটি হজের গুরুত্বপূর্ণ রুকনগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সাঈ সম্পন্ন করা হয়—বিশেষ করে তামাত্তু হজের ক্ষেত্রে সাঈর বিষয়টি অবশ্যই নিজের হজের ধরন অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
১০. ১১–১২ জিলহজ
মিনায় অবস্থান করে তিন জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়। কেউ ১২ জিলহজে চলে গেলে এবং নির্ধারিত বিধান পূরণ করলে তার জন্য পরবর্তী দিনের কঙ্কর নিক্ষেপ আবশ্যক থাকে না; আর ১৩ জিলহজ পর্যন্ত অবস্থান করলে ১৩ তারিখেও কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়।
পুরুষের এহরামে যেসব বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখবেন
সেলাই করা পোশাক পরবেন না
মাথা ঢাকবেন না
এহরামে নতুন করে সুগন্ধি ব্যবহার করবেন না
চুল বা নখ কাটবেন না
শিকার করবেন না
যৌন সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকবেন
সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের গাইডেও এহরামের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে চুল কাটা, নখ কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পুরুষের সেলাই করা পোশাক পরার বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। কিনুন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
হজের তামাত্তু, ইফরাদ ও কিরান—এই তিন ধরনের হজের আমলের ক্রম এক নয়। তাই শুধু একটি সাধারণ তালিকা অনুসরণ না করে আপনি কোন ধরনের হজ করছেন সেটি নিশ্চিত করে আমল করা উচিত। সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের গাইডেও এই তিন ধরনের হজ আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।